সীমান্ত হত্যা একটি মানবতাবিবর্জিত ঘটনা

By: পল্লব শাহরিয়ার
Date: 2012-05-21

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ শুধু পাক-ভারত বৈরিতার প্রভাবমুক্তই হয়নি, স্বাধীনতার মাত্র তিন মাস পর মিত্রবাহিনীর দেশত্যাগের দৃষ্টান্তও স'াপিত হয়, যা বিশ্বের ইতিহাসে অনন্য ঘটনা। পার্শবর্তী শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলাও আমাদের পররাষ্ট্রনীতির একটি অংশ। ভারত দ্বারা যেমন লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা আছে তেমন ঝুঁকি ও নেহাত কম নয়। এই ঝুঁকিপুর্ণ ইস্যু গুলোর মধ্যে একটি বহুল আলোচিত ইস্যু বর্ডার-কিলিং বা সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি হত্যা। বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেই অর্থনীতি ও পারসপরিক সমপর্ক নিয়ে রাজনীতির প্রভাব সীমান্তে পড়লেও মূলত ৯/১১-এর পর সীমান্তে হত্যাকান্ড সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। ফেলানী বা বাংলাদেশি নির্যাতনের বহু ঘটনা অজ্ঞাতেই রয়ে যায়। ২০০৯ সালে সীমান্তে হত্যাকান্ড বন্ধে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একটি রিপোর্ট প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। ২০১১ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, বিএসএফ গত ১২ বছরে ৯০০ জনকে হত্যা করেছে। (Human Rights Watch. Retrieved 21 Januarz 2011)) সামপ্রতিক সময়ের পরিসংখ্যানের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ৩৫০ জন বাংলাদেশিকে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করেছে। ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে বিএসএফ এক সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করে যে তারা বিগত ছয় মাসে ৫৯ জনকে গুলি করে হত্যা করেছে, যার ৩৪ জন বাংলাদেশি এবং ২১ জন ভারতীয়; চারজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। (http://in.reuters.com/article/topNesw/idINIndia-35156020080824); আগস্ট ২০০৮ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৭৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ২০০৯ সালের ফেলানীর ঘটনা এবং সমপ্রতি ভারতের এনডিটিভিতে ঘুষ না দেওয়ায় বিএসএফ কর্তৃক নির্যাতনের ভিডিও প্রচারিত হলে তা ব্যাপকভাবে আলোচিত সমালোচিত হয়। সীমান্তে হত্যাকান্ডের জন্য যে সব কারণ গুলো দেখানো হয় তাহলো- ১) সীমান্তে হত্যার প্রধান কারণ হিসেবে ভারত ক্রস-বর্ডার টেররিজমকে উল্লেখ করে থাকে। বিভিন্ন সময়ে ভারতের বিভিন্ন স'ানে বোমা হামলার প্রভাব পড়ে সীমান্তে। আসামের উলফাসহ বিচ্ছিন্নতাবাদী দল এবং পাকিস্তানের আইএসআই পরিচালিত জঙ্গিদের দমন কার্যক্রমে বেশির ভাগ শিকার হয় নিরীহ জনগণ। গুলিতে নিহত অজ্ঞাত বা পরিচয়হীনরা বিএসএফের জবাবদিহির একটি বিষয় হিসেবে উপস'াপিত হতে সহায়তা করে। ২) দ্বিতীয় কারণটি উল্লেখ করা হয় অবৈধ অভিবাসনকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে দেখা যায়, পালিয়ে থাকা প্রায় সকল শীর্ষ-সন্ত্রাসীর অবস'ান ভারতে। ভারতীয় মিডিয়ায় অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা ৫০ লাখ থেকে এক কোটি পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তারা অবৈধ অভিবাসনকে চিহ্নিত করেছে। অভিবাসন বন্ধে মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রভাবিত করতে ব্যবহূত হয় বর্বর পন্থা। ৩) বাংলাদেশকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ করা হয়ে থাকে। দশ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার সে অভিযোগের সত্যতা প্রকাশে ভূমিকা রেখেছে। এ ঘটনায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা করার বিষয়টিও আলোচিত। ৪) সীমান্তে হত্যার শিকার হওয়ার অন্যতম কারণ গরু চুরি বা পাচার। গৃহপালিত গরু সীমানা পেরিয়ে গেলে ফিরিয়ে আনার সময় সন্দেহভাজন হিসেবে গুলির শিকার হয়। আবার গরু পাচারের বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। ৫) চোরাচালান বর্ডার-কিলিংয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়। গরু বা অস্ত্র ছাড়াও ড্রাগস এবং বিভিন্ন পণ্য চোরাচালানের জন্য সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর কোনো বিকল্প নেই। চোরাচালানি চক্র তাদের এই কাজে ব্যবহার করে বেকার কিংবা নারী ও কিশোরদের। বাংলাদেশে যেমন ভারত-বিরোধিতা নিয়ে রাজনীতি করা হয় তেমনি ভারতেও বিজেপির মতো দলগুলো বাংলাদেশ বিরোধিতাকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করে, যার প্রভাব পড়ে সীমান্তে। কিন' পার্থক্য হলো ভারতে জাতীয় স্বার্থে সকল দল ঐক্যবদ্ধ থাকে আর বাংলাদেশে ইস্যু খোঁজা হয় ক্ষমতা গ্রহণের সিঁড়ি হিসেবে। বিগত জোট সরকারের আমলে সীমান্তে ৩৫০ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছে, যা বন্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপই গৃহীত হয়নি। বর্তমান জোট সরকারের আমলে ব্যপক আলোচনা - সমালোচনা হয় এর ব্যপকতা আরো বৃদ্ধি পাওযায়। কুটনৈতিক চাপ সৃষ্টির সুযোগ থাকলেও এবিষয়ে কযেকজন পদস্ত ব্যক্তিবর্গের অশংলগ্ন মন্তব্য ছাড়া তেমন কোন পদক্ষেপ লক্ষনীয় নয়। যাইহোক, সীমান্তে হত্যাকান্ডের যতই কারণ দেখানো হোক, এটি নিঃসন্দেহে মানবতাবিবর্জিত একটি ঘটনা। বিএসএফ কর্তৃক হত্যাকান্ডের শিকার ভারতীয়দের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ, মতান্তরে ৪০ শতাংশ। উল্লেখ্য, কোনো বাংলাদেশিকে হত্যা করা হলে আমরা অন্তত জানতে পারি কিন' বেশির ভাগ ক্ষেত্রই ভারতীয় নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়টি তাদের সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয় না। সীমান্তে হত্যা বন্ধে সমপ্রতি ভারতে চারজন বিএসএফ সদস্যকে বরখাস্ত করাসহ সাতজনকে কারাদন্ড দেওয়ার সংবাদ পারসপরিক সমপর্ক উন্নয়নের একটি ইতিবাচক দিক। হত্যাকান্ডের সংখ্যা শূন্যে আনার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। কারণসমূহ নির্দিষ্ট করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে যে উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে, তা ফলপ্রসূ হবে বলে আশা করা যায়।
You may also like

ভারতীয় সেনাদের অনুপ্রবেশের আশঙ্কা রোধ করতে হবে
By: মো হা ম্ম দ জ য় না ল আ বে দী ন
On: 2012-05-01